জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বার্ষিক প্রতিবেদন
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বার্ষিক প্রতিবেদন
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো দক্ষ মানবসম্পদ। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে, প্রযুক্তির অগ্রগতি দ্রুত বদলে দিচ্ছে কর্মক্ষেত্রের ধরন, আর দেশীয় চাহিদাও দিন দিন পরিবর্তিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—NSDA—এর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রতি বছর শুধু একটি সরকারী নথি নয়; বরং দেশের সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বিকাশ, প্রশিক্ষণ কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার এক সুস্পষ্ট রূপরেখা হয়ে ওঠে।
২০২৪–২৫ অর্থবছরের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে NSDA তাদের বিভিন্ন কর্মসূচি, অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা বাংলাদেশের দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থা কতটা সুসংগঠিত ও অগ্রসর হচ্ছে তার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন। নিম্নে প্রতিবেদনের আলোকে বাংলাদেশের দক্ষতা উন্নয়নের সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করা হলো।
দক্ষতা উন্নয়নের জাতীয় অগ্রাধিকার
প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কেবল শিক্ষিত জনগোষ্ঠী নয়, বরং দক্ষ জনগোষ্ঠীই দেশের উন্নয়নের প্রধান শক্তি। বাংলাদেশের লক্ষ্য—২০২৪ সালের মধ্যেই দক্ষতা মানদণ্ড উন্নত করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিযোগিতামূলক দক্ষ জনশক্তির কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া।
এই লক্ষ্যে NSDA যেসব পদক্ষেপকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে তার মধ্যে রয়েছে—
-
শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতার মান নির্ধারণ
-
প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানসমূহকে মানসম্পন্ন কাঠামোর আওতায় আনা
-
বেসরকারি খাতকে দক্ষতা উন্নয়নে আরও সম্পৃক্ত করা
-
তরুণদের জন্য কর্মমুখী দক্ষতা উন্নয়ন (EVET, Apprenticeship)
-
‘Recognition of Prior Learning’ (RPL) সম্প্রসারণ
-
বিদেশমুখী কর্মীর জন্য আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা প্রশিক্ষণ
এই অগ্রাধিকার সূচকগুলো বৈশ্বিক কর্মবাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে আরও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সহায়তা করবে।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অগ্রগতি
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে চলতি বছর NSDA তাদের অনুমোদিত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন ট্রেডে প্রায় কয়েক লাখ প্রশিক্ষণার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। বিশেষ করে ICT, গার্মেন্টস/অ্যাপারেল, ইলেকট্রিক্যাল, অটোমেশন, ডিজিটাল মার্কেটিং, মাল্টিমিডিয়া, হসপিটালিটি এবং নির্মাণ খাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মহিলা অংশগ্রহণের বৃদ্ধি
বার্ষিক প্রতিবেদন দেখায়, মোট প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ ৩৮%–এর বেশি, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
এই অগ্রগতি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
RPL–এর মাধ্যমে শ্রমিকের দক্ষতা স্বীকৃতি
যেসব শ্রমিক বহু বছর ধরে কোনো দক্ষতা অর্জন করেও সার্টিফিকেট পাননি, NSDA–র Recognition of Prior Learning কর্মসূচি তাদের দক্ষতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিচ্ছে।
এ বছর RPL–এর আওতায় বিভিন্ন খাতের প্রায় হাজারো শ্রমিক সার্টিফায়েড হয়েছেন।
দক্ষতা মানদণ্ড উন্নয়ন (NSSF)
জাতীয় দক্ষতা মানদণ্ড কাঠামো (National Skills Standard Framework–NSSF) NSDA–র অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। বর্তমান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—
-
NSSF–এর পর্যায়ভিত্তিক দক্ষতা কাঠামো আন্তর্জাতিক মান (NVQF)–এর সঙ্গে সামঞ্জস্য করা হয়েছে
-
২০০+ কারিকুলাম পুনর্গঠন করা হয়েছে
-
শিল্পখাতের বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে Competency Standard তৈরি করা হয়েছে
এগুলো প্রশিক্ষণের গুণগত মান উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
শিল্প–বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা
প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, দক্ষতা উন্নয়নে সরকার–বেসরকারি অংশীদারত্বের (PPP) গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। NSDA শিল্পখাতের সাথে সমন্বয় করে—
-
Apprenticeship Program
-
On-the-job Training
-
Industry Advisory Panel
-
Sector-based skill mapping
এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণকে বাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে আরও বেশি সমন্বিত করেছে।
বিশেষ করে অ্যাপারেল, লেদার, ICT, গাড়ি মেরামত, ইলেকট্রনিক্স, নির্মাণ ও হসপিটালিটি সেক্টরে শিল্প–প্রতিষ্ঠানগুলো এখন প্রশিক্ষণ কারিকুলাম নির্ধারণেও ভূমিকা রাখছে।
প্রবাসী শ্রমবাজারের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন
বাংলাদেশের রেমিট্যান্স নির্ভর অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে NSDA অভিবাসন–উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রশিক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে—
-
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের চাহিদা অনুযায়ী বিশেষায়িত ট্রেড যুক্ত হয়েছে
-
ভাষা, নিরাপত্তা, মৌলিক আইন, কর্ম–সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ জোরদার করা হয়েছে
-
International Accreditation প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে
এর ফলে বিদেশগামী শ্রমিকদের বেতন, নিরাপত্তা এবং সুযোগ–সুবিধা বৃদ্ধির সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হয়েছে।
চ্যালেঞ্জ : যে বাধাগুলো এখনো রয়ে গেছে
যদিও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি রয়েছে, প্রতিবেদনে কিছু চ্যালেঞ্জও তুলে ধরা হয়েছে—
১. দক্ষতা প্রশিক্ষণে মানসম্মত প্রশিক্ষকের ঘাটতি
বেশ কিছু ট্রেডে যোগ্য প্রশিক্ষকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম।
২. প্রশিক্ষণ–পূর্ব ও পরবর্তী মূল্যায়ন ব্যবস্থার দুর্বলতা
জব–প্লেসমেন্ট সঠিকভাবে ট্র্যাক করা কঠিন।
৩. প্রযুক্তি–নির্ভর প্রশিক্ষণে অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা
৪র্থ শিল্পবিপ্লবের দক্ষতা শেখাতে আরও আধুনিক ল্যাব ও যন্ত্রপাতির প্রয়োজন।
৪. বেসরকারি খাতের পূর্ণ সম্পৃক্ততার অভাব
শিল্প–প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ এখনও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগে অনীহা দেখায়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা : ডিজিটাল দক্ষতা, সবুজ দক্ষতা, স্মার্ট বাংলাদেশ
প্রতিবেদনে NSDA ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা হিসেবে কয়েকটি বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে—
১. স্মার্ট বাংলাদেশ–এর জন্য স্মার্ট স্কিলস
AI, Blockchain, Data Analysis, Robotics, Cybersecurity–সহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ।
২. Green Skills উন্নয়ন
পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ই–ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ট্রেডকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৩. জাতীয় দক্ষতা তথ্যব্যবস্থা ডিজিটালাইজেশন
National Human Resource Development Database তৈরি করা।
৪. দক্ষতা–ভিত্তিক শিক্ষার সম্প্রসারণ
স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে Competency-based learning চালু করা।
৫. কর্মসৃজনমুখী প্রশিক্ষণ বিস্তৃতি
স্থানীয় চাহিদার ওপর ভিত্তি করে উপজেলা পর্যায়ে নতুন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা।

No comments